ঢাকা অফিস : ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে টানা তৃতীয়বারের মতো জয় পেল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস। এর মধ্য দিয়ে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির যে বেসামাল ঢেউ শুরু হয়েছিল, তাও আপাতত থামল। মাসব্যাপী আট ধাপের বিশাল নির্বাচনযজ্ঞে শুধু ভারত নয়; সংগত কারণেই প্রতিবেশী দেশগুলোরও এ নির্বাচনের দিকে দৃষ্টি ছিল। বিজেপির হয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যেভাবে মাঠে নেমেছিলেন, তাতেই এ লড়াই শেষ পর্যন্ত মোদি বনাম মমতার যুদ্ধে পরিণত হয়। খেলা হবে- স্লোগান নিয়ে ভোটের মাঠে নামা মমতা তাতে জিতলেন; হেরে গেলেন মোদি। ‘নিজের মেয়েকেই বেছে নিল বাংলা’র মানুষ।

বিজেপির ভোটের রাজনীতিতে ধর্মীয় বিভাজনের যে সুর বেজে উঠেছিল, পশ্চিমবঙ্গের বহু ধর্ম-বর্ণের মানুষ তাও থামিয়ে দিল। তবে বিজেপি-তৃণমূলের এই হারজিতের লড়াইয়ে বাম-কংগ্রেস এবার দৃশ্যের আড়ালেই চলে গেল। এই জোটের শরিক আইএসএফের একটি ছাড়া কোনো আসন তারা পায়নি। স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে এই প্রথম বাম-কংগ্রেস বিধানসভার বাইরে চলে গেল।

নিজের আসন নন্দীগ্রামে রাজনৈতিক শিষ্য শুভেন্দু অধিকারীর কাছে মাত্র ১৭৩৬ ভোটের ব্যবধানে হারলেও তৃতীয়বার মুখ্যমন্ত্রী হচ্ছেন মমতাই। গতকাল রোববার দলীয় কার্যালয়ে এসে বিষয়টি তিনি দলীয় নেতাকর্মীদের জানান। ভারতের সংবিধান অনুযায়ী, কোনো অনির্বাচিত ব্যক্তি মুখ্যমন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রী হলে তাকে ছয় মাসের মধ্যে কোনো আসনে জয়ী হয়ে আসতে হবে। সে সুযোগ মমতার জন্য খোলা।

করোনার কারণে জয়ী প্রার্থীদের সনদ দেওয়া স্থগিত রেখেছে নির্বাচন কমিশন। সনদ দেওয়ার পর তাদের শপথ অনুষ্ঠিত হবে। তবে সেই তারিখ এখনও ঘোষণা করা হয়নি।

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার ২৯৪ আসনের মধ্যে দুটির ভোট গ্রহণ প্রার্থীর মৃত্যুতে স্থগিত ছিল। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ১৪৮টি আসন। করোনা মহামারির ভয়াবহতার মধ্যে কঠোর স্বাস্থ্যবিধি মেনে গতকাল ২৯২ আসনের ভোট গণনার পর বেসরকারি ফল ঘোষণা করে ভারতের নির্বাচন কমিশন। সর্বভারতীয় টেলিভিশন চ্যানেল এনডিটিভি রাতে জানায়, তৃণমূল কংগ্রেস এককভাবে ২১৪টি আসনে জয় পেয়েছে। তবে কয়েকটি আসনে বড় ব্যবধানে এগিয়ে থাকা প্রার্থীদের জয়ী ধরে নিয়ে এই ফল জানিয়েছে তারা। এদিকে, দুই শতাধিক আসনে জয়ের টার্গেটে নামা বিজেপি থেমেছে ৭৬ আসনে। কংগ্রেস শূন্য, সিপিআইএমসহ বাম জোট শূন্য এবং এই জোটের শরিক আইএসএফ পেয়েছে মাত্র ১টি আসন। অন্যান্য দলের একজন জয় পেয়েছে। ফল ঘোষণা বাকি ছিল দুটি আসনে। বাম-কংগ্রেস-আইএসএফ জোটের এই হারকে ঐতিহাসিক পরাজয় হিসেবে দেখছেন বিশ্নেষকরা। ২০১৬ সালে কংগ্রেস জোট ৪৪টি এবং বাম জোট ২৬টি আসন পেয়ে কিছুটা মুখ রক্ষা করতে পারলেও এবার ঝুড়ি একেবারেই শূন্য।

তৃণমূল কংগ্রেসের জয় নিশ্চিত হওয়ার পর মমতাকে অভিনন্দন জানিয়ে টুইট করেছেন প্রধানমন্ত্রী মোদি। নির্বাচনে বাম-কংগ্রেসকে হটিয়ে এবার দ্বিতীয় বৃহত্তম দলে পরিণত হয়েছে তার দল বিজেপি। টুইটে মোদি বলেন, ‘মমতা দিদিকে পশ্চিমবঙ্গে তার দল তৃণমূলের জয়ের জন্য অভিনন্দন জানাই। কেন্দ্র পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে জনগণের প্রত্যাশা ও করোনা মহামারি থেকে বের হয়ে আসতে সব ধরনের সম্ভাব্য সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে।’ যদিও নির্বাচনের আগে থেকেই করোনা নিয়ে মোদির বিরুদ্ধে অবহেলা ও পশ্চিমবঙ্গকে অসহযোগিতা করার অভিযোগ করে আসছেন মমতা।

এবার পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির প্রধান দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা ছিলেন অমিত শাহ। রাজ্যের নেতাদের হাত থেকে নির্বাচনের ভার নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে সবচেয়ে বেশি পরিশ্রমও করেছিলেন তিনি। ঘুরেছেন বাংলার গ্রামে গ্রামেও। তার বক্তব্য ছিল খুবই আক্রমণাত্মক। অবৈধ অনুপ্রবেশ ইস্যুটি তিনিই বারবার উচ্চারণ করেছেন। তিনিই বলেছিলেন, বিজেপি জিতলে বাংলাদেশ থেকে সীমান্ত পার হয়ে একটি পাখিও ঢুকতে পারবে না। তবে দলের শেষ রক্ষা করতে পারেননি তিনি। ২০১৬ সালে যেখানে তিনটি আসন পেয়েছিল বিজেপি, সেখানে এবার ৭৬টি আসন পেয়েছে। এটি তাদের বড় পাওয়া। পরাজয় নিশ্চিত হওয়ার পর এক টুইটে অমিত শাহ লিখেছেন, ‘বাংলার মানুষের রায়কে সম্মান জানাচ্ছি।’ রাজ্যে বিজেপিকে শক্তিশালী করার জন্য রাজ্যবাসীকে ধন্যবাদ জানান তিনি।

রাজ্যে দুর্দান্ত জয়ের জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে টুইট করে অভিনন্দন জানিয়েছেন রাহুল গান্ধী। তিনি লিখেছেন, দুর্দান্ত জয়ের জন্য মমতাজিকে অভিনন্দন।

বিজেপি, কংগ্রেস ও অন্যান্য দলের শীর্ষ নেতারাও মমতাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। অসাম্প্রদায়িক ভারতের পক্ষে লড়াই করা লেখক, বুদ্ধিজীবী ও অ্যাক্টিভিস্টরাও মুখ্যমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। ভারতের কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী বিজেপির সাবেক সভাপতি রাজনাথ সিং এবং কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ মমতাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল, সমাজবাদী পার্টির সভাপতি অখিলেশ যাদব মমতার এই জয়কে মোদি-হাওয়ার বিরুদ্ধে বৈপ্লবিক ঘটনা বলে অভিহিত করেছেন।

লেখক ও অ্যাক্টিভিস্ট বিনায়ক সেন ধারাবাহিক টুইটে মমতাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। একই সঙ্গে মোদি-অমিতদের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে মমতার জয়কে বিরাট অগ্রযাত্রা হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেছেন, মোদির প্রধানমন্ত্রিত্বের দিনও ফুরিয়ে আসছে। ভারতের প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী ও অ্যাক্টিভিস্ট কবীর সুমনও মমতার জয়কে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে মানবতার জয় বলে বর্ণনা করেছেন।

error: Content is protected !!