ঢাকা অফিস : জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) থেকে শুরু করে ট্রেড লাইসেন্স ও টিন সার্টিফিকেট- সবই নিখুঁতভাবে জাল করে তারা। এরপর ব্যাংকের চোখে ধুলো দিয়ে সেইসব কাগজপত্র ব্যবহার করেই নেয় কোটি কোটি টাকা ঋণ। পরে ঋণের কিস্তি পরিশোধ না করায় তাদের খোঁজে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। তখন দেখা যায় ঋণগ্রহীতার পরিচয়-কাগজপত্র সবই ছিল জাল। এমনই একটি প্রতারক চক্রের পাঁচ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

ডিবি কর্মকর্তারা বলছেন, ঢাকা ব্যাংকসহ অন্তত ১১ টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতারণার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে চক্রটি। এক্ষেত্রে ভুয়া এনআইডি তৈরিতে সহায়তা করে খোদ নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ের কিছু অসাধু কর্মচারী। বিষয়টি অবহিত হওয়ার পর জড়িত ৪৪ কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে কর্তৃপক্ষ। এর সঙ্গে ব্যাংকের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশ আছে কি-না তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলো- আল আমিন ওরফে জমিল শরীফ, খ ম হাসান ইমাম ওরফে বিদ্যুত, আবদুল্লাহ আল শহীদ, রেজাউল ইসলাম ও মো. শাহজাহান। মঙ্গলবার রাতে রাজধানীর খিলগাঁও ও রামপুরা এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করে ডিবির মতিঝিল বিভাগের খিলগাঁও জোনাল টিম। এ সময় তাদের কাছ থেকে একটি প্রাইভেটকার জব্দ করা হয়।

প্রতারক চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে জানাতে বুধবার রাজধানীর মিন্টো রোডের ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এতে অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) এ কে এম হাফিজ আক্তার বলেন, জালিয়াতির মাধ্যমে ঢাকা ব্যাংক লিমিটেডের অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় গত বছরের ৭ ডিসেম্বর খিলগাঁও এবং ১৩ ডিসেম্বর পল্টন থানায় দু’টি মামলা হয়। তদন্তের একপর্যায়ে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি বিপ্লব নামে একজনকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। পরে সে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এই পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের মধ্যে আল আমিন ও বিদ্যুৎ চক্রটির প্রধান। তারা প্রয়োজন অনুযায়ী চক্রের অন্যদের কখনও ক্রেতা, কখনও বিক্রেতা, আবার কখনও জমির মালিক, কখনও ফ্ল্যাটের মালিক সাজাত। আব্দুল্লাহ আল শহীদ ভুয়া এনআইডি তৈরির মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করত। ভুয়া ট্রেড লাইসেন্স ও টিন সার্টিফিকেট তৈরি করে দিত রেজাউল ও শাহজাহান।

তিনি জানান, প্রতারকরা প্রথমে ব্যাংকে গিয়ে ফ্ল্যাট কেনার ঋণের বিষয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে। কর্মকর্তারা পরিদর্শন করতে চাইলে তারা একটি ফ্ল্যাট দেখায়। এর আগেই তারা ওই ফ্ল্যাট বিক্রির সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রাখে। কৌশলে ফ্ল্যাটের প্রকৃত মালিকের কাছ থেকে তার এনআইডি কার্ড ও ফ্ল্যাটের কাগজপত্রের ফটোকপি সংগ্রহ করে। ব্যাংক কর্মকর্তারা পরিদর্শনের সময় সব কিছু ঠিকঠাক দেখতে পান।

অতিরিক্ত কমিশনার জানান, নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ের কিছু অসাধু কর্মচারীর মাধ্যমে ফ্ল্যাট মালিকের কাছ থেকে নেওয়া এনআইডির শুধু ছবি বদলে ফেলে প্রতারকরা। সেখানে চক্রের একজনের ছবি বসিয়ে দেওয়া হয়। ফলে ওই ভুয়া এনআইডি দিয়ে নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট বা সার্ভারে সার্চ দিলে তা সঠিক দেখায়। এদিকে প্রতারকরা ১/২ মাসের জন্য একটি অফিস ভাড়া নেয়। ব্যাংক কর্মকর্তাদের ওই অফিস পরিদর্শনের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কর্মকর্তারা সাজানো-গোছানো অফিস দেখতে পান। ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশনের দিন ব্যাংকের লোক উপস্থিত থাকেন। এনআইডি কার্ড, ব্যাবসা প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স ও টিন সার্টিফিকেট ঠিক আছে দেখে ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশনের দু’-একদিন পর ব্যাংক কর্তৃপক্ষ পে-অর্ডারের মাধ্যমে ঋণের টাকা দিয়ে দেয়। পরে ঋণের কিস্তি পরিশোধ না করায় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সার্ভারে অনুসন্ধান করে ওই এনআইডির কোনো তথ্য দেখতে পায় না।

এক প্রশ্নের উত্তরে অতিরিক্ত কমিশনার বলেন, প্রতারকরা ব্যাংকসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা আত্মসাৎ করেছে। এর মধ্যে শুধু ঢাকা ব্যাংকেরই প্রায় দেড় কোটি টাকা হাতিয়েছে চক্রটি।

ডিবির শীর্ষ এ কর্মকর্তা বলেন, ফ্ল্যাট কেনার ঋণ মঞ্জুরের ক্ষেত্রে আরও বেশি যাচাই-বাছাই করতে হবে। এ ধরনের প্রতারণার ক্ষেত্রে পুলিশকে অবহিত করার অনুরোধ করেন তিনি।

error: Content is protected !!