নিজস্ব প্রতিনিধি॥ কুষ্টিয়া শহরে চেতনাধ্বংসী ড্রাগ বা রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করে একদল প্রতারক চক্র সর্বস্ব হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে। চক্রটি অভিনব প্রতারনার মাধ্যমে শিশু নারীসহ বিভিন্ন বয়সীদের স্বাভাবিক চেতনাকে লোপ করে হাতিয়ে নিচ্ছে স্বর্ণালংকার,মোবাইল ফোন, নগদ টাকাসহ মূল্যবান জিনিস। এই অপরাধ চক্রের সাথে জড়িয়ে পড়ছে নারী ও শিশুসহ তরুন যুবকরা।
কুষ্টিয়া শহরের প্রানকেন্দ্র মডেল থানার মাত্র ১শ মিটার দুরত্বের মধ্যে অবস্থিত পাবলিক লাইব্রেরীর সম্মুখস্থ ফুটপথে গত ২৫মে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার শিকার শহরের উদিবাড়ি এলাকার বাসিন্দা লতা খাতুনের মুখে ঘটনার বিবরনে এমন একটি প্রতারণার চিত্র ফুটে উঠেছে।

বিষয়টি নিয়ে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একজন চিকিৎসকের সাথে কথা হলে তিনি জানান, সাধারণত এধরনের প্রতারনার অপরাধ সংঘটনে অপরাধী চক্র ভয়ংকর ড্রাগ স্কোপোলামাইন ব্যবহার করে থাকে।

ঘটনাস্থলের আশপাশের সিসি টিভির ফুটেজ বিশ্লেষন করে দেখা যায় শহরের এন এস রোডে অবস্হিত বড় মসজিদ মার্কেটের সিসিটিভি ফুটেজ ও ভুক্তভোগীর বক্তব্য অনুসারে ২৫ মে দুপুরে লতা খাতুন(৩০)নামের একজন গৃহবধূ মসজিদের সামনে নাইস বেকারি থেকে একটি আইসক্রিম কিনে নিজ শিশু কে খেতে দেন।এরপর পাবলিক লাইব্রেরীর নিকট আসার পথে একটি অপরিচিত ১৩/১৪ বছরের একটি বালক নিজে খুব ক্ষুধার্ত জানিয়ে খাবার কিনে দিতে অনুরোধ করে।হাতের ব্যাগ দেখিয়ে একটু কথা আছে বলে পাবলিক লাইব্রেরীর পূর্ব পাশের গলিতে ডেকে নেয়। ছেলেটি নিজেকে শাহীন বেকারির কর্মচারী পরিচয় দিয়ে ব্যাগটি মহিলার হাতে দিয়ে বলে,আমি আর কাজ করবো না।বেতন দেয় না।।দুদিন না খেয়ে আছি।এখানর কেক বানানোর গুরুত্বপূর্ণ জিনিস আছে।ব্যাগটি দোকানের ফর্সা ছেলেটিকে দিবেন এবং দয়া করে কিছু খাবার নিয়ে আসেন। ব্যাগটি হাতে ধরার পর আরো দু’জন যুবক এগিয়ে আসেন।তারাও ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে মহিলাটিকে অনুরোধ করেন। এরপর মহিলাটি তাদের বাধ্যগত হয়ে যায়। তাদের কথামতো কানের দুল,গলার চেন ও মোবাইলটি অপরিচিত বালকটির নিকট দিয়ে ব্যাগটি নিয়ে বেকারিতে যায়। বেকারির লোকজন ব্যাগটি নিতে অস্বীকার করায় ফিরে এসে ওদের কাউকে দেখতে না পেয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন।২৮ মে শবিরার রাতে শহরের উদি বাড়ী ভাড়া বাসায় ভুক্তভোগী ওই গৃহবধু উপস্থিত সাংবাদিকদের নিকট উল্লেখিত তথ্য তুলে ধরেন । তিনি জানান ব্যাগটি নেওয়ার পর আমার আর বুদ্ধি কাজ করে নি। মাথার মধ্যে ঝিম ঝিম করছিল। তখন আমি ওদের বাধ্যগত হয়ে গেছি। তিনি আরো জানান, ঘটনার পর পরই কুষ্টিয়া মডেল থানায় এ বিষয়ে একটি অভিযোগ দিলে তাৎক্ষনিক থানার একজন দারোগা ঘটনাস্থলে নিকটস্থ সিসি ফুটেজ সংগ্রহও করেছেন বলে দাবি করেন গৃহবধু লতা খাতুন। তবে অভিযোগটি নথি ভুক্ত হয়েছে কিনা তা বলতে পারছি না।

২০২১ সালের ডিসেম্বর মাসের ৩ তারিখে আমাদের সময় ডট কম পত্রিকায় স্কোপোলামাইন ড্রাগ সম্পর্কে একটি নিবন্ধ প্রকাশ হয়েছিল। পাঠকদের সচেতন করতে নিবন্ধটির আংশিক তুলে ধরা হলো,

“বাংলাদেশে সম্প্রতি সাধারণ মানুষকে লুটে নিতে ব্যবহার করা হচ্ছে স্কোপোলামাইন (ঝপড়ঢ়ড়ষধসরহব) নামের এই ভয়ঙ্কর ড্রাগটি। এটির বৈজ্ঞানিক নাম হায়সিসিন। কেউ একজন আপনার কাছে এসে একটি কাগজ বা মোবাইলের মেসেজ দেখিয়ে বলবে ”আন্টি/ভাই/আপু এই ঠিকানাটা কোথায় ?” কিংবা কোন এক অসহায় ব্যক্তি একটি প্রেসক্রিপশন দেখিয়ে বলবে ‘বাবা, এই প্রেসক্রিপশনের ওষুধের নামটা কী? কোথায় পাওয়া যাবে ?’ স্বভাবতই আপনি মানবিক বোধ থেকে তাদের সাহায্য করতে যাবেন, আর এখানেই আপনি ফেঁসে গেলেন বা ফাঁদে পা দিলেন।

ইচ্ছা করেই কাগজে লেখাগুলো ছোট করে রাখা হয় যাতে ‘সম্ভাব্য টার্গেট’ মোবাইল বা কাগজটা ভাল করে পড়ার জন্য নাক ও মুখের কাছাকাছি নিয়ে আসতে বাধ্য হয়। তাদের দেওয়া কাগজ, ফোন বা অন্যকিছু আপনি নাক, চোখমুখের কাছাকাছি ধরার সাথে সথে সেখানে লেগে থাকা স্কোপোলামিন আপনার নিঃশ্বাসের সাথে গ্রহণ করে ফেললেন। এর পরে আপনার আর কিছুই করার থাকবেনা।

আপনার মাথা ঝিমঝিম লাগবে এবং আপনি বুঝবেন না আপনি কী করছেন! আপনার নিজের প্রতি কোন নিয়ন্ত্রণ আপনার থাকবেনা। আপনাকে বলা মাত্র আপনি নিজ থেকেই সব করবেন। আপনার কাছে থাকা টাকাপয়সা, গহনা, মোবাইল সহ সব দিয়ে দিবেন আপনার সামনে থাকা চক্রের সদস্যের হাতে।”

১৯৯০ সালের দিকে এনেস্থেসিয়ার জন্য প্রথম স্কোপোলামাইন ব্যবহার শুরু হয়। এনস্থেশিয়ার জন্য প্রথমে এককভাবে স্কোপোলামাইন ব্যবহারের প্রস্তাব করা হলেও পরে স্কোপোলামাইন এবং মরফিনের সংমিশ্রণে ব্যবহার করা হয়।

২০২১ সালের প্রথম তিন মাস ডিবি পুলিশ পরিচয়ে ছিনতাইকারী চক্র কুষ্টিয়াবাসী কে অতিষ্ঠ করে তুলেছিল। অবশেষে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাড়াশি অভিযানে প্রাইভেট কারসহ আন্তঃজেলা ছিনতাইকারী চক্র আটক করে।একই বছরের মার্চ মাসে কুষ্টিয়া শহরের শেখ রাসেল সেতুর উপর থেকে মটর সাইকেল ছিনতাইকালে একজনের মোবাইলে ধারনকৃত ছবিতে স্হানীয় দুইজন ছিনতাইকারী সনাক্ত হয়।পুলিশ নয়ন ও সুজন নামের দুই ছিনতাইকারীকে আটক করার পর জনমনে স্বস্তি ফিরে এসেছিল।

এবিষয়ে কুষ্টিয়া মডেল থানার পুলিশ পরিদর্শক (ওসি) সাব্বিরুল আলম জানান, ‘এমন একটি ঘটনা শুনেছি, বিষয়টির সত্যাসত্য দেখার জন্য আমার একজন অফিসারকে দায়িত্ব দিয়েছি। ওরা তদন্ত করে যদি সত্যতা পায় তাহলে অবশ্যই জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.